রাত তখন প্রায় আড়াইটা। পুরো ঢাকা শহর
যখন ঘুমে কাদা, তখন ঘরের কোণের টেবিলটায় একটা ল্যাপটপের
স্ক্রিন একা আলো ছড়াচ্ছে। ল্যাপটপের একটা ট্যাবে হয়তো কালকের ইভেন্টের
ভলান্টিয়ারদের ডিউটি রোস্টার গোছানো হচ্ছে, আরেকটা ট্যাবে
খোলা ইউনিভার্সিটির অ্যাসাইনমেন্ট বা কোনো ক্লায়েন্টের গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা
কোডিংয়ের কাজ, আর পাশে পড়ে আছে একটা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের
কাপ।
ফেসবুক বা লিংকডিনের নিউজফিড স্ক্রল
করলে আমাদের জীবনটাকে বড্ড রঙিন মনে হয়। কোনো অ্যাওয়ার্ডের স্টেজে দাঁড়িয়ে ট্রফি
হাতে হাসিমুখের ছবি, বড় কোনো সেমিনারে টাই-স্যুট পরে প্যানেল
স্পিকার হিসেবে হাত নেড়ে কথা বলার ফ্রেম, এসব
দেখে যে কেউ ভাবতেই পারেন, "বাহ! এই ছেলে বা
মেয়েটা তো অল্প বয়সেই ফাটিয়ে দিচ্ছে!"
কিন্তু এই ঝকঝকে ফ্রেমের ঠিক ১০
ইঞ্চি পেছনে যে অন্ধকার, একাকীত্ব আর প্রতিনিয়ত ভেঙে চুরমার হয়ে
যাওয়ার গল্প থাকে, তা কেবল আমাদের মতো মাঠপর্যায়ের মানুষরাই
জানে। আজ কোনো রাখঢাক না রেখে, আমাদের এতদিনের অবজারভেশন এবং
সম-অভিজ্ঞতার সারকথাগুলো এক সুতোয় বেঁধে একটা গল্প বলি। এই গল্পটা প্রশংসা পাওয়ার
নয়, এই গল্পটা টিকে থাকার।
১. থ্যাংক
ইউ ফর কামিং, বাট ‘ইউ
আর টু ইয়ং’!
গল্পটা শুরু হয় এক বুক স্বপ্ন নিয়ে।
বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসা কোনো দারুণ আইডিয়া যখন আমরা গ্রাউন্ডে নামাতে চাই, তখন প্রথম ধাক্কাটা আসে আমাদের চেনা সমাজ আর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কাছ
থেকে।
মনে আছে সেই দিনটার কথা? যখন একটা ফাইল বগলে নিয়ে কোনো কর্পোরেট অফিস বা সিনিয়র কোনো ব্যক্তিত্বের
দরজায় কড়া নেড়েছিলাম? ইস্তিরি করা একমাত্র ভালো শার্টটা পরে,
রাতে না ঘুমিয়ে বানানো প্রেজেন্টেশনটা যখন তাদের সামনে ওপেন করলাম,
তখন তাদের চোখের ভাষাটা কেমন ছিল?
সেখানে আইডিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে
আলোচনা কম হয়েছিল, বরং আমাদের বয়স আর এক্সপেরিয়েন্সের ওজন মাপা
হয়েছিল বেশি। টেবিলের ওপাশ থেকে এক চিলতে মুচকি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলা হয়েছিল,
"আইডিয়াটা কিউট, কিন্তু তোমরা তো
এখনো অনেক ছোট। বড় দায়িত্ব সামলাতে পারবে তো?" অনেক সময় আমাদের বড় বড় সেমিনারে দাওয়াত দেওয়া হয়, স্টেজের
প্রথম সারিতে বসানোও হয়। কিন্তু যখন মূল পলিসি বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসে,
তখন আমাদের আড়ালে রেখে বলা হয়, "তোমরা জাস্ট ভলান্টিয়ার টিমটা ম্যানেজ করো, বাকিটা
আমরা দেখছি।" এই ‘টোকেনিজম’
বা শুধু দেখানোর জন্য তরুণদের ব্যবহার করার কালচারটা আমাদের ভেতরের লিডারটাকে
প্রতিদিন একটু একটু করে রক্তাক্ত করে।
২. পকেট
মানির ইকোনমি বনাম কর্পোরেট সিএসআর
একটা প্রজেক্ট চালাতে গেলে শুধু
সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়, কাগজের নোটের প্রয়োজন হয়। কিন্তু
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যুব-সংগঠনগুলোর ফান্ডিংয়ের গল্পটা এক চরম ট্র্যাজেডি।
আমাদের কোনো বড় ডোনার নেই, নেই কোনো ফিক্সড স্পন্সর। আমাদের অর্গানাইজেশনগুলো টিকে থাকে এক অদ্ভুত ‘পকেট
মানি ইকোনমি’-র ওপর।
টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে, রিকশা ভাড়া বাঁচিয়ে হেটে গিয়ে, কিংবা নিজের ফ্রিল্যান্সিং বা পার্টটাইম জবের উপার্জনের একটা বড় অংশ দিয়ে
আমরা ব্যানার প্রিন্ট করি, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য খাবার
কিনি কিংবা ইভেন্টের ভেন্যু ভাড়া করি।
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিএসআর (CSR) ফান্ডের দরজায় যখন আমরা যাই, তখন আমাদের সামনে ছুড়ে
দেওয়া হয় আমলাতান্ত্রিকতার এক বিশাল দেয়াল
"আপনাদের ৩ বছরের অডিট রিপোর্ট দেখান, সরকারি রেজিস্ট্রেশন দেখান, জয়েন্ট স্টকের লাইসেন্স
দেখান।" আরে ভাই, আমরা মাত্র ২১-২২
বছরের ক’টা তরুণ
মিলে একটা ভালো কাজ করতে চাচ্ছি, আমাদের ৩ বছরের অডিট
রিপোর্ট কোত্থেকে আসবে? ফল যা হওয়ার তাই হয়
ফান্ডের এই গোলকধাঁধায় পড়ে প্রতি বছর কত শত অসাধারণ আইডিয়া যে
খাতার পাতা থেকে আলোর মুখ দেখার আগেই মরে যায়, তার কোনো হিসাব
দেশের কোনো পরিসংখ্যানে নেই।
৩. ট্রিপল
লাইফ ব্যালেন্স এবং একটি নীরব ‘বার্নআউট’
আমাদের সমবয়সী একটা সাধারণ ছেলে বা
মেয়ে যখন বিকেলে আড্ডা দিচ্ছে বা রাতে নিশ্চিন্তে সিনেমা দেখছে, তখন একজন যুবনেতাকে একই সাথে তিনটা সমান্তরাল জীবনে বাঁচতে হয়। এটাকে আমি
বলি 'ট্রিপল লাইফ ক্রাইসিস'।
- ফ্রন্ট ১ (শিক্ষা): ইউনিভার্সিটির বা কলেজের ক্লাসের প্রেশার, ল্যাব অ্যাসাইনমেন্ট, এটেন্ডেন্স এবং সিজিপিএ
ঠিক রাখার লড়াই। কারণ দিনশেষে পরিবার কিন্তু সিজিপিএ-র হিসাবটাই আগে চাইবে।
- ফ্রন্ট ২ (ক্যারিয়ার): নিজেকে ফিউচার মার্কেটের জন্য রেডি করা। গ্রাফিক ডিজাইন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট বা অন্য কোনো স্কিল নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটুনি,
ক্লায়েন্টের ডেডলাইন হ্যান্ডেল করা এবং নিজের পকেট সচল রাখা।
- ফ্রন্ট ৩ (নেতৃত্ব): নিজের ভলান্টিয়ার টিম বা সংগঠনের ১০০-২০০ মেম্বারের দেখভাল করা, কার কী সমস্যা তা শোনা, ইভেন্টের প্ল্যান করা
এবং সবাইকে মোটিভেটেড রাখা।
এই তিন চাকার রিকশাটা টানতে টানতে
একটা সময় চাকা বসে যায়। যাকে আমরা বলি 'Burnout'। একটা তীব্র মানসিক অপরাধবোধ গ্রাস করে—"আমি
কি অন্যের উপকার করতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে ফেলছি? আমার ভবিষ্যৎ কী?" এই প্রশ্নটার উত্তর কোনো
যুবনেতা তার টিমের সামনে দিতে পারে না। তাকে হাসিমুখে টিমের সামনে ‘সব
ঠিক আছে’র মুখোশ পরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, আর রাতে একা একা বালিশে মাথা গুঁজে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।
৪. যখন
ভলান্টিয়াররা ‘ঘোস্ট’ এর মতো আচরন করে: নেতার একাকীত্ব
একটি পেইড জবে মানুষকে ধরে রাখা সহজ, কারণ মাস শেষে একটা স্যালারি শিট থাকে। কিন্তু সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে চলা
একটা টিমের মেম্বারদের মোটিভেশন ধরে রাখা পৃথিবীর অন্যতম কঠিন কাজ।
শুরুতে একটা প্রজেক্টের সময় ৫০ জন
ভলান্টিয়ার বুক ফুলিয়ে বলে,"ভাইয়া/আপু, আমি আছি! যেকোনো কাজে ডাকবেন।" কিন্তু
প্রজেক্টের ডেডলাইন যখন ঘনিয়ে আসে, যখন আসল গ্রাউন্ডের খাটুনি
শুরু হয়, তখন একে একে সবাই অদৃশ্য হতে থাকে। কারো পরীক্ষা,
কারো ফ্যামিলি ক্রাইসিস, কেউ বা স্রেফ মেসেজ
সিন করে রিপ্লাই দেওয়া বন্ধ করে দেয় (Ghosting)।
বড় একটা ইভেন্টের আগের রাতে যখন দেখা
যায় মূল কাজের মানুষটাই নেই, তখন সমস্ত চাপটা এসে পড়ে ওই
লিডারের একার কাঁধে। তখন নিজেকে বড্ড একলা মনে হয়। মনে হয়, পুরো
দুনিয়ার বোঝাটা বুঝি আমি একাই টানছি। টিম ম্যানেজমেন্টের এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধটা
আমাদের ম্যাচিউরড বানায় ঠিকই, কিন্তু তার জন্য অনেক বড়
মানসিক মূল্য চুকাতে হয়।
৫.
অন্ধকারে পথ চলা: যেখানে কোনো ম্যাপ নেই
আমাদের দেশে স্টার্টআপগুলোর জন্য পিচ
ডেক বানানো বা ইনকিউবেশনের ব্যবস্থা থাকলেও, যারা সোশ্যাল বা
কমিউনিটি লেভেলে লিডারশিপ দিচ্ছে, তাদের জন্য কোনো
প্রাতিষ্ঠানিক গাইডলাইন বা মেন্টরশিপের ব্যবস্থা নেই।
একটা ইভেন্টের পারমিশন কীভাবে নিতে
হয়, পুলিশের সাথে কীভাবে ডিল করতে হয়, ক্রাইসিস
মোমেন্টে কীভাবে মিডিয়া হ্যান্ডেল করতে হয়, এগুলো আমাদের
কোনো টেক্সটবুক শেখায় না। আমরা প্রতিটা পদক্ষেপে ভুল করি, হোঁচট
খাই, হাঁটু ছঁড়ে রক্ত বের হয় এবং সেই ক্ষত নিয়েই আবার উঠে
দাঁড়িয়ে পথ চলি। এই 'Trial and Error' প্রসেসটা শুনতে
রোমাঞ্চকর লাগলেও, বাস্তব অভিজ্ঞতাটা অত্যন্ত নিষ্ঠুর। একজন
প্রপার মেন্টর থাকলে যে ভুলগুলো এক মিনিটে এড়ানো যেত, তা
শিখতে আমাদের বছরের পর বছর লেগে যায়।
শেষ কথা:
আমরা কি তাহলে থামিয়ে দেব?
নাহ, গল্পটার শেষটা আমি
ট্র্যাজিক করতে চাই না। এত সব বাধা, ফাণ্ডিংয়ের অভাব,
আস্থার সংকট আর মেন্টাল ট্রমার পরও বাংলাদেশের এই তরুণ লিডাররা
কিন্তু মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যায়নি। তারা সীমিত সম্পদ আর ভাঙা মন নিয়েই পরের দিন সকালে
আবার নতুন কোনো ইভেন্টের ব্যানার টানাতে চলে যায়।
কিন্তু আমাদের প্রশ্নটা এই সিস্টেমের
কাছে, আমরা আর কতদিন শুধু নিজেদের পিঠ ঠেকিয়ে লড়াই করব? যদি তরুণদের আসলেই দেশের মূল চালিকাশক্তি ভাবা হয়, তবে
তাদের শুধু 'ভলান্টিয়ার' নামক সস্তা
শ্রমের ট্যাগ না দিয়ে, তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে জায়গা
দিন। তাদের আইডিয়াগুলোকে ট্রাস্ট করুন, কর্পোরেট সিএসআর-এর
নিয়ম কিছুটা শিথিল করে তরুণদের মাইক্রো-গ্র্যান্টস দিন।
আর সবচেয়ে বড় কথা, দূর থেকে হাততালি না দিয়ে, কখনো আমাদের টেবিলে এসে
আমাদের কাঁধে হাত রেখে জাস্ট এইটুকু বলুন "তোমরা লড়ছ,
আমরা তোমাদের পাশে আছি।" বিশ্বাস
করুন, এই একটা বাক্যই আমাদের মতো যুবনেতাদের আরও হাজারটা রাত
না ঘুমিয়ে কাজ করার অক্সিজেন জোগাতে যথেষ্ট।
আপনার
কাছে প্রশ্ন: আপনিও কি কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত আছেন? একজন ভলান্টিয়ার বা লিডার হিসেবে আপনার মধ্যরাতের লড়াইয়ের গল্পটা কী?
কমেন্টে শেয়ার করুন (একটু স্ক্রল করলেই পাবেন), অন্তত এইটুকু জানুন যে, এই
লড়াইয়ে আপনি একা নন।
.jpg)